ঢাকা : ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিককে ঘিরে আবারো একটি মহল পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত—এমন অভিযোগ উঠেছে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র ও সহকর্মীদের পক্ষ থেকে। তাদের দাবি, আসন্ন পদোন্নতিকে (অতিরিক্ত আইজিপি পদে) কেন্দ্র করে একটি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যারা বিভিন্নভাবে তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
সূত্র বলছে, পদোন্নতি, পদায়ন ও চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি ঠেকাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে রেজাউল করিম মল্লিকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কখনো তার বিরুদ্ধে অসত্য অভিযোগ, আবার কখনো বিভিন্ন ঘটনা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে তার নিজের ব্যাচ এবং আগের ব্যাচের কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত।
রেজাউল করিম মল্লিকের ঘনিষ্ঠজনেরা মনে করছেন, পেশাগত প্রতিযোগিতা ও পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতেই এই অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে তাকে বিভিন্নভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করছে, যাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে যেতে না পারেন। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের জাতীয়তাবাদী শক্তির কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি রয়েছে একমাত্র রেজাউল করিম মল্লিকের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে খবর আসে রেজাউল করিম মল্লিককে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিটের প্রধান করা হচ্ছে। এই খবরের পর তার পূর্ববর্তী ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা ও নিজের ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি বৈঠক হয়। সেখানে বলা হয়, ‘রেজাউল করিম মল্লিককে ঠেকাও। সে ম্যাডামের (প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া) অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলো। পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত আইজিপি হলে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে তাকে পদায়ন করা হবে’। এরপরই কিছু অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট বা অপ্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম থেকেই রেজাউল করিম মল্লিককে নিয়ে অপপ্রচার ছড়ানো শুরু হয়।’
উল্লেখ্য, বর্তমানে পুলিশের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রেজাউল করিম মল্লিকের পূর্ববর্তী একটি ব্যাচের কর্মকর্তারা। এ অবস্থায় সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে তার (রেজাউল করিম মল্লিক) কোন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়নের সম্ভাবনাকে সেই যড়যন্ত্রকারী গ্রুপটি নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
জানা গেছে, কুচক্রী মহল বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢাকা রেঞ্জে ওসি পদায়নে রেঞ্জ ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিকের নামে আর্থিক লেনদেন, অনিয়মের বানোয়াট, অসত্য গুজব ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ থানায় ওসি পদায়নের সম্পূর্ণ এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারের, এক্ষেত্রে রেঞ্জ ডিআইজির কোন ভূমিকাই নেই। তারপর রেজাউল করিম মল্লিককে জড়িয়ে ওসি পদায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে মনগড়া তথ্য গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এমনকি কিছু দালাল সুবিধাবাদী ব্যক্তি তাকে ফোন করে ব্ল্যকমেইলিংয়ের চেষ্টাও করছে। তার ঘনিষ্টজনদেরকেও এই কুচক্রী মহল নানাভাবে ফোনে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ইমেজ ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।’
এ ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য বিশ্বাস না করার পরামর্শ তাদের।
জানা যায়, ১৯৯৮ সালে ১৭তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করা রেজাউল করিম মল্লিক বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে একমাত্র জাতীয়তাবাদী ঘরনার কর্মকর্তা যিনি ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের পদধারী সক্রিয় সদস্য ছিলেন। শুধু তাই নয়, বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত বিশেষায়িত সংস্থা ‘চেয়ারপারসন’স সিকিউরিটি ফোর্সের (সিএসএফ)’ অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি।
জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে এ সম্পৃক্ততা তার কর্মজীবনে নানা সময়ে প্রভাব ফেলেছে বলে সহকর্মীরা উল্লেখ করেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময়ে তিনি পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত ছিলেন এবং অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়িত হন। তাছাড়া চাকুরিজীবনে ১৭ মাসের মাথায় তাকে হাসিনা সরকার চাকুরি থেকে অব্যাহতি দেয়। পরবর্তী ৪ বছর পর মামলা করে আবার চাকুরিতে পুনর্বহাল হন।
পুলিশ সুপার হিসেবে সিআইডিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় তাকে প্রতিদিন অফিস হাজিরার সময় শেখ মুজিবুর রহমান ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবির নিচে দাঁড়িয়ে হাজিরা হিসেবে মোবাইলে ছবি তুলে সিআইডির তৎকালীন প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়াকে পাঠাতে হতো- এমন অভিযোগও শোনা যায় সহকর্মীদের মুখে। অসুস্থ হলেও ছুটি পাওয়া ছিল কষ্টকর।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার রেজাউল করিম মল্লিককে ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেয়। প্রথমে তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান করা হয়। দায়িত্ব পালনকালে হঠাৎ করেই কোনো কারণ ছাড়া তাকে ডিবি থেকে প্রত্যাহার করা হয়। আর এতে সরাসরি কলকাঠি নাড়েন সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরী। বিষয়টি সেসময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই তাকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবি তোলেন। এক রকম জনদাবীর মুখেই পরে রেজাউল করিম মল্লিককে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে পদায়ন করা হয়।
৫ আগস্ট পরবর্তী ডিবিকে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। বিশেষ করে তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপি, সচিব, আইজিপি, সেনা-নৌ বাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীসহ ৩০০’-এর অধিক বড় বড় পদধারীদের দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ডিবিকে মানুষ ‘হারুনের ভাতের হোটেল’ নামে চিনতো। তৎকালীন কর্মকর্তারা যাকে তাকে তুলে এনে গুমের পাশাপাশি অর্থ হাতিয়ে নিতো। রেজাউল করিম মল্লিক ডিবিপ্রধান হবার পর পুলিশের এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটি শতভাগ সেবামুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুনাম ফিরে পায়। যা দেশের ইতিহাসে বিরল।
















