মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
একটি ব্র্যান্ডকে পরিচিত করতে গল্পের প্রয়োজন হয়। কিন্তু একটি ব্র্যান্ডকে বিশ্বাসযোগ্য করতে প্রয়োজন প্রমাণ। আমার দৃষ্টিতে, স্বাস্থ্যসেবায় এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন মানুষ যখন কোনো হাসপাতাল বা চিকিৎসকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি শুধু একটি সুন্দর বার্তা শুনতে চান না; তিনি জানতে চান, সেই বার্তার পেছনে বাস্তব ভিত্তি কী।
আজকের সময়ে একটি হাসপাতাল তার দক্ষতা, প্রযুক্তি, চিকিৎসক, সেবা কিংবা অর্জন নিয়ে খুব সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও, সংবাদমাধ্যম—সবকিছু মিলিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি তৈরি করা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা এক বিষয় নয়।
বিশ্বাস তৈরি হয় যখন একটি প্রতিষ্ঠানের কথা এবং তার বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে মিল থাকে।
স্বাস্থ্য যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তথ্যের নির্ভুলতা, স্বচ্ছতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সহজবোধ্যতার ওপর গুরুত্ব দেয়। কারণ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য মানুষের সিদ্ধান্ত ও আচরণকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
তাই আমার কাছে হেলথকেয়ার ব্র্যান্ডিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আমরা কী বলছি, তার পাশাপাশি আমরা কী দেখাতে পারছি?
একটি হাসপাতাল যদি উন্নত প্রযুক্তির কথা বলে, তাহলে সেই প্রযুক্তি মানুষের চিকিৎসায় কীভাবে কাজে লাগছে, সেটি বোঝানো দরকার। যদি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কথা বলা হয়, তাহলে তাঁর অভিজ্ঞতা ও বিশেষায়িত দক্ষতার তথ্য স্পষ্ট হওয়া দরকার। যদি কোনো চিকিৎসা সেবার অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়, তাহলে সেই সেবার বাস্তব পরিধি ও সক্ষমতার তথ্য মানুষের সামনে থাকা উচিত। অর্থাৎ, একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড শুধু দাবি করে না; তার দাবির পেছনে প্রমাণ রাখে।
আমার অভিজ্ঞতায়, এখানেই ব্র্যান্ড এবং পিআরের সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পিআরের কাজ শুধু সংবাদ তৈরি করা নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের বাস্তব কাজ, অর্জন, মানুষের উপকারে আসা উদ্যোগ এবং বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারেন—এটিও পিআরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
একইভাবে ডিজিটালের কাজ শুধু সেই গল্পকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া নয়। ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে তথ্যকে আরও সহজ, পরিষ্কার ও প্রাসঙ্গিক করে তোলাও জরুরি।
ধরা যাক, একটি হাসপাতাল কোনো বিশেষ চিকিৎসা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। শুধু “আমরা সেরা” বলা হয়তো একটি প্রচারণার ভাষা হতে পারে। কিন্তু কত বছর ধরে সেই সেবা দেওয়া হচ্ছে, কী ধরনের বিশেষজ্ঞ দল রয়েছে, কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, কতজন রোগী সেই সেবা পেয়েছেন—যে তথ্যগুলো যথাযথভাবে প্রকাশযোগ্য, সেগুলো সামনে আনলে মানুষের কাছে ছবিটি আরও পরিষ্কার হয়।
আমি মনে করি, এখানেই হেলথকেয়ার ব্র্যান্ডিংয়ের ভবিষ্যৎ আরও তথ্যভিত্তিক হবে। কারণ মানুষ এখন একটি প্রতিষ্ঠানের নিজের বলা কথার পাশাপাশি বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য যাচাই করতে পারেন। একজন চিকিৎসকের নাম সার্চ করতে পারেন, হাসপাতালের ওয়েবসাইট দেখতে পারেন, সংবাদ প্রতিবেদন পড়তে পারেন, ভিডিও দেখতে পারেন কিংবা অন্য মানুষের অভিজ্ঞতা জানতে পারেন। ফলে ব্র্যান্ডের প্রতিটি বক্তব্যকে আরও বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তথ্যনির্ভর হতে হয়।
এই পরিবর্তন মার্কেটিংয়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আগে একটি ভালো ক্রিয়েটিভ আইডিয়া অনেক সময় ক্যাম্পেইনের কেন্দ্র হতে পারত। এখন ক্রিয়েটিভ আইডিয়ার পাশাপাশি প্রশ্ন করতে হয়—এই বার্তার ভিত্তি কী? মানুষের জন্য এর উপকার কী? আমরা কি এটিকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারছি? এবং মানুষ যদি আরও জানতে চান, তাহলে কি তাকে নির্ভরযোগ্য তথ্যের দিকে নিয়ে যেতে পারছি?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বর্তমান যোগাযোগ কাঠামোও স্বাস্থ্যবার্তাকে শুধু আকর্ষণীয় করার পরিবর্তে তা যেন অ্যাক্সেসিবল, রিলেভেন্ট, অ্যাকশনেবল, টাইমলি, ক্রেডিবল ও আন্ডারস্ট্যান্ডেবল হয়—সেদিকে গুরুত্ব দেয়। আমার কাছে এটাই হেলথকেয়ার ব্র্যান্ড বিল্ডিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন—ফ্রম সেইং মোর টু প্রুভিং বেটার।
এর অর্থ এই নয় যে গল্পের প্রয়োজন নেই। বরং ভালো গল্প আরও শক্তিশালী হয় যখন তার পেছনে বাস্তবতা থাকে। একজন রোগীর অভিজ্ঞতা, একজন চিকিৎসকের দীর্ঘদিনের কাজ, একটি নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, একটি জনসচেতনতামূলক উদ্যোগ কিংবা একটি চিকিৎসা বিভাগের অর্জন—এসব গল্প তখনই অর্থবহ হয়, যখন গল্পটি বাস্তব কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
আর এখানেই একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতির গুরুত্ব আসে। বাইরে একটি প্রতিষ্ঠান যে পরিচয় তুলে ধরছে, ভেতরের মানুষদের কাজেও যদি সেই মূল্যবোধ প্রতিফলিত হয়, তাহলে ব্র্যান্ড আরও শক্তিশালী হয়। কারণ ব্র্যান্ড শেষ পর্যন্ত শুধু কমিউনিকেশন টিম’র রেসপন্সিবিলিটি নয়; এটি পুরো প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত পরিচয়।
আমি বিশ্বাস করি, আগামী দিনের স্বাস্থ্যসেবা ব্র্যান্ডগুলোকে শুধু বেশি দৃশ্যমান হওয়ার চেষ্টা করলে হবে না। তাদের আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। আর বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হবে যখন কথার সঙ্গে কাজের, প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সক্ষমতার ও যোগাযোগের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার একটি পরিষ্কার সম্পর্ক থাকবে।
একটি ভালো গল্প মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে। একটি ভালো বিজ্ঞাপন মানুষকে মনে করিয়ে দিতে পারে। কিন্তু একটি বাস্তব প্রমাণ মানুষকে বিশ্বাস করার কারণ দেয়।
স্বাস্থ্যসেবায় তাই সবচেয়ে শক্তিশালী ব্র্যান্ড সেই নয়, যে সবচেয়ে বেশি নিজের কথা বলে; বরং সেই ব্র্যান্ড, যার কথা মানুষ বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারে।
লেখক : হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম
















