চট্টগ্রাম : ১৯৮৭ সালে আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) চারুকলা বিভাগে নাট্যকলা শাখায় প্রিলিমিনারি মাস্টার্সের ছাত্র। একদিন আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক কামাল উদ্দিন নীলু আমাকে বললেন, জেলা শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামে নাট্যকলার প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে। তার অনুপ্রেরণায় ১৯৮৭ সালের জুলাই মাসে সেখানে যোগদান করি।
তখন ছিল টিনের চালের তিনটি ঘর, সপ্তাহে দুই দিন ক্লাস হতো। দুই বছরের কোর্সের জন্য নীলু স্যারের সহযোগিতায় আমরা একটি সিলেবাস দাঁড় করাই। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের পড়াশোনা, অন্যদিকে শিল্পকলায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান। দুই দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করেছি নিষ্ঠার সঙ্গে। ১৯৯০ সালে মাস্টার্স শেষ করি।
১৯৯৬ সালে আর্ট গ্যালারি ভবন ও শিল্পকলা একাডেমির মূল ভবন নির্মাণ হলে আমাদের দীর্ঘদিনের শ্রেণিকক্ষ সমস্যার সমাধান হয়। পরে ২০১০ সালের পর প্রশিক্ষণ কোর্স চার বছরে উন্নীত হয়। একজন প্রশিক্ষকের পক্ষে চার বর্ষের শিক্ষার্থী পড়ানো, প্রযোজনা করানো এবং একাডেমির নানা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া সত্যিই কঠিন দায়িত্ব ছিল।
দেখতে দেখতে ৩৮ বছর প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছি, খুবই সামান্য সম্মানিতে। কিন্তু এই পথ ছিল সম্মান, ভালোবাসা ও আত্মতৃপ্তিতে ভরা। সহকর্মীদের মধ্যে জেলা কালচারাল অফিসার মানসি দাশ তালুকদার, মোসলেম উদ্দিন শিকদার, আয়াজ মাবুদ- ভাই সবার সান্নিধ্য পেয়েছি। সঙ্গীত বিভাগের সহকর্মী সমিরণ দা আজ আর আমাদের মাঝে নেই। আরও অনেকে এসেছেন, চলে গেছেন। আজ যারা বিদায় নিচ্ছেন মোস্তফা ভাই, রহিম ভাই, স্বপন দা- তারা সকলেই গুণী শিল্পী ও শিক্ষক।
জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কী? শিক্ষকতা আমাকে দিয়েছে ছাত্র-শিক্ষকের এক অনন্য, মধুর ও সম্মানময় সম্পর্ক। এই সম্পর্কের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, স্মৃতি—সবই অতুলনীয়। সত্যিই, এগুলো কখনও ভুলার নয়।
বলছিলেন জেলা শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামের নাট্যকলা বিভাগের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক জোবাইদ রশীদ।
শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামের নৃত্য বিভাগের প্রশিক্ষক ও ওড়িশী অ্যান্ড টেগোর ড্যান্স মুভমেন্ট সেন্টার চট্টগ্রামের পরিচালক নৃত্য শিল্পী প্রমা অবন্তী বলেন, ‘জোবায়দুর রশিদ ভাই প্রথম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার অধীনে নাট্যকলা শাখা প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং বাংলাদেশে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যকলা স্নাতকোত্তর ডিগ্রির অধিকারী। তিনি অন্য বিষয়ের দিকে না গিয়ে নাট্যকলা নিয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি যদি চারুকলার অধীনে নাট্যকলা শাখায় ভর্তি না হতেন, আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ নাট্যকলা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হতো কিনা সন্দেহ। নিভৃতচারী, নিরহংকারী এই মানুষটি আমাদের সমাজে একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমি তার এই সাহসীকতাকে কুর্নিশ জানাই।’
নাট্যকলা বিভাগের সদ্য ৪ বছর মেয়াদী কোর্স শেষ করা জোবাইদ রশীদের ছাত্র ও শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামের ফ্যান গ্রুপের এডমিন ফোরকান রাসেল বলেন, ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামের নাট্যকলা বিভাগকে স্যার একাই টেনে নিয়ে আজ এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। একজন অভিনয় শিল্পী হতে অভিনয় বা নাটক কাকে বলে সেই পর্যায় থেকে হাতেখড়ি হয় অসংখ্য নাট্যকর্মীর তার হাত ধরে। স্যারের অবসরকালীন এই বিদায় নাট্য জগতের জন্য এক রত্ন হারানোর মতই। তবে স্যারের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।’
জীবন বয়ে যায়, কিছু মানুষ আড়ালেই কাজ করে যায়। তেমন একজন মানুষ জোবাইদ রশীদ, যিনি জেলা শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামের নাট্যকলা বিভাগের প্রশিক্ষণের কাজ করে গিয়েছেন পর্দার আড়ালে থেকেই।
















