বিদায় নিয়েছে আরবি বছর ১৪৪৭। ইসলামে হিজরি সন ও তারিখের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ হিজরি সন এমন একটি সন- যার সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর তাহজিব-তামাদ্দুন ও ঐতিহ্যের ভিত্তি সম্পৃক্ত। মুসলমানদের রোজা, হজ, ঈদ, শবেবরাত, শবেকদর ও শবে মেরাজসহ ইসলামের বিভিন্ন বিধিবিধান হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও আনন্দ-উৎসবসহ সব ক্ষেত্রেই মুসলিম উম্মাহ হিজরি সনের অনুসারী।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম একের পর এক আমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয় ঠিক কিন্তু হিজরি সনের শুভ আগমন উপলক্ষে হইচই নেই, নেই কোনো প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার বিশেষ কোনো আয়োজন। যেমনভাবে বিশেষ আয়োজন পরিলক্ষিত হয় ঈসায়ি নববর্ষের আগমনে। বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে উদযাপন করা হয় তাতে মনে হয় হিজরি নববর্ষ যেন আমাদের কোনো প্রয়োজনই নেই! অথচ হিজরি নববর্ষকে গুরুত্ব সহকারে পালন করাই ছিল আমাদের মুসলিম অধ্যুষিত দেশে কাম্য। হিজরি সন গণনার সূচনা হয়েছিল ঐতিহাসিক এক অবিস্মরণীয় ঘটনাকে উপলক্ষ করে। রাসুলের (সা.) এবং তার সঙ্গী-সাথিদের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই আরবি মহররম মাসকে হিজরি সনের প্রথম মাস ধরে সাল গণনা শুরু হয়েছিল। আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে পবিত্র মক্কা থেকে মদিনায় রাসুলের (সা.) হিজরত থেকেই হিজরি সনের সূচনা। স্বাগত হিজরি নববর্ষ ১৪৪৮।
খোলাফায়ে রাশেদার শাসনকালে মদিনাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গোড়াপত্তন হলে অফিসিয়াল তথ্যাদির নথি ও দিনক্ষণের হিসাব রাখতে গিয়ে বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নররা বিপাকে ও অসুবিধায় পড়েন। যেহেতু তখন ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো বর্ষপঞ্জি বা একক সন চালু ছিল না। রাষ্ট্রীয় অফিসিয়াল কার্যাদি নির্বিঘ্নে ও যথানিয়মে সম্পন্ন করার প্রয়োজনে নতুন সন প্রবর্তন তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে। খলিফাতুল মুসলিমীন হজরত উমর ফারুকের (রা.) শাসনামলে ১৬ হিজরি সনে প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআরির (রা.) ইরাক এবং কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একদা হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) খলিফা উমরের (রা.) খেদমতে এ মর্মে পত্র লেখেন যে, আপনার পক্ষ থেকে পরামর্শ কিংবা নির্দেশ সংবলিত যেসব চিঠি আমাদের কাছে পৌঁছে তাতে দিন, মাস, সাল, তারিখ ইত্যাদি না থাকায় কোন চিঠি কোন দিনের তা নিরূপণ করা আমাদের জন্য সম্ভব হয় না। এতে করে আমাদের নির্দেশ কার্যকর করতে খুব কষ্ট হয়। অনেক সময় আমরা বিব্রতবোধ করি চিঠির ধারাবাহিকতা না পেয়ে।
হজরত আবু মুসা আশআরির চিঠি পেয়ে হজরত উমরকে (রা.) এ মর্মে পরামর্শ সভার আহ্বান করেন এখন থেকে একটি ইসলামী তারিখ প্রবর্তন করতে হবে। ওই পরামর্শ সভায় হজরত উসমান (রা.) হজরত আলীসহ (রা.) শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কেরাম এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত সবার পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে এ সভায় হজরত উমর (রা.) সিদ্ধান্ত দেন ইসলামী সন প্রবর্তনের। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জুমাদাল উলা ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দ। সেই থেকে আজ পর্যন্ত হিজরি সনের মাসগুলো মুসলমানদের জীবনধারার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে।
ইসলামে হিজরি সনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। আল্লাহপাক এরশাদ করেন নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গণনা হিসেবে মাস হলো ১২টি (মহররম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউস সানি, রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ)। যেদিন থেকে তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এর মধ্যে চারটি মাস বিশেষ সম্মানিত (সুরা তাওবাহ : ৩৬)। হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। মহররম শব্দের অর্থ সম্মানিত। ইসলামের ইতিহাসে এই মাসটি এমন কতগুলো উল্লেখযোগ্য স্মৃতিবিজড়িত যে স্মৃতিসমূহের সম্মানার্থেই এই মাসকে মহররম বা সম্মানিত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
মহররম মাসের করণীয় আমলগুলো হলো চাঁদের প্রথম রাতে নফল নামাজ ও প্রথম দিনে নফল নামাজ। প্রথম দশ দিন নফল রোজা। আর হারাম বা সম্মানিত চারটি মাস হলো-মহররম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ। মহররম একটি তাৎপর্যমণ্ডিত এবং বরকতময় মাস। মুসলিম ইতিহাসে এ মাসটি বিভিন্ন কারণে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। কোরআনে এ মাসটিকে ‘শাহরুল্লাহ’ তথা আল্লাহর মাস বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
মহররম মাসের ১০ তারিখকেই আশুরা বলা হয়। নিঃসন্দেহে আশুরার দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদার দিন। এ দিনটি মুসলিম উম্মাহকে পৃথিবীর বিভিন্ন ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ দিনেই ঘটেছে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক কারবালা ঐতিহাসিক ঘটনা। এক কথায় এ দিনটি দ্বীন প্রতিষ্ঠায় হিজরত এবং হক তথা উত্তম প্রতিষ্ঠার জন্য এক সুমহান দিন। এ কারণেই মুসলিম উম্মাহ এ দিনটিকে বিশেষ ইবাদাত-বন্দেগি তথা রোজা পালনের দিন হিসেবে শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালন করে থাকে।
কারবালার চেতনা
হজরত ইমাম হোসাইনে (রা.) ফোরাতের তীরে কারবালার প্রান্তরে আত্মদান মূলত অসত্য, অসুন্দর, অন্যায় ও অকল্যাণের বিরুদ্ধে সত্য-সুন্দর-ন্যায় ও কল্যাণের অনন্তকালের জন্য আদর্শিক বিজয়ের চেতনা। কারবালার চেতনা অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের চেতনা। মহররম মাস আসবে প্রতিবছর ঘুরে, আশুরা আসবে বারবার ঘুরেফিরে, কারবালার চেতনা জাগ্রত হবে প্রতিটি সংকট মুহূর্তে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘জালিম শাসকের সম্মুখে হক কথা বলা উত্তম জিহাদ।’
মহররম মাসের ১০ তারিখ আশুরার দিনটি হজরত মুসা আলাইহিস সালাম ও তার সঙ্গী-সাথীদের জন্য বিজয়ের দিন হলেও এ দিনেই ঘটেছে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয় বিদরাক ও মর্মান্তিক কারবালা ঐতিহাসিক ঘটনা। আল্লাহর জমিনে দ্বীন তথা উত্তম প্রতিষ্ঠায় ইসলামের অগ্রসেনানী হজরত হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর এ আত্মত্যাগ এক মহাঅনুপ্রেরণা।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলে পাক (সা.) বলেন, ‘রমজানের রোজার পরে মহররমের রোজা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ যেমন ফরজ নামাজের পরে শেষ রাতের তাহাজ্জুদ নামাজ সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন।’
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.)বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে পরিবারের ব্যয় বৃদ্ধি করবে, ভালো খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করবে আল্লাহ সারা বছর তার প্রাচুর্য বাড়িয়ে দেবেন। আগে মুসলমানদের জন্য আশুরার রোজা ফরজ ছিল। দ্বিতীয় হিজরিতে শাবান মাসে রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা সুন্নত হয়ে যায়। তবে সুন্নত রোজার মধ্যে আশুরার রোজা সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) চারটি আমল কখনো পরিত্যাগ করেননি- আশুরার রোজা, জিলহজ মাসের প্রথম দশকের রোজা, আইয়ামে বিদ (প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) রোজা এবং ফজরের ফরজের পূর্বে দুই রাকাত সুন্নত নামাজ। প্রিয় নবীজি (সা.) এর প্রিয় তিনটি আমল যা তিনি কখনো পরিত্যাগ করেননি-তাহাজ্জুদ নামাজ, প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজা ও রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ।
আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পড়া
পবিত্র আশুরা ও কারবালা দিবস একই দিনে সংঘটিত হয়েছে। এই দিনে তওবা-ইস্তিগফার ও রোজা রাখার পাশাপাশি আহলে বাইতের (নবী-পরিবারের সদস্যদের) জন্য দোয়া ও দরুদ পাঠের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের (রহ.) মতে নবীজির (সা. ওপর দরুদ পাঠের সময় তার পরিবারের ওপর দরুদ পাঠ করা ওয়াজিব। হানাফি মাজহাবের ইমামদের মতে সুন্নত। যেমন আমরা দরুদ পাঠ করতে পারি, আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মদ, ওয়া আলা আলি মুহাম্মদ। অর্থাৎ, হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মদের ওপর আপনার রহমত বর্ষণ করুন এবং তার পরিবারবর্গের ওপরও রহমত করুন।
নতুন বছর ও নতুন চাঁদের দোয়া
নতুন বছরে এই দোয়া পড়লে বছরটি ভালো কাটবে। ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুবি ওয়াল আবছার ইয়া মুদাব্বিরাল্লাইলি ওয়ান্নাহার ; ইয়া মুহাওয়িলাল হাওলি ওয়াল আহওয়াল হাওয়িল হালানা ইলা আহ্ছানিল হাল। অর্থ : হে অন্তর ও দৃষ্টিগুলো পরিবর্তনকারী! হে রাত ও দিনের আবর্তনকারী! হে সময় ও অবস্থা বিবর্তনকারী! আমাদের অবস্থা ভালোর দিকে উন্নীত করুন।
উল্লেখ্য, এই দোয়া বছরব্যাপী সব সময় পড়া যায়। নতুন বছরের সঙ্গে আসে নতুন মাসও। নতুন চাঁদে এই দোয়া পড়লে মাসটি নিরাপদ হবে। আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ইমান ওয়াছ ছালামাতি আল ইসলাম রব্বি ওয়া রব্বুকাল্লাহ হিলালু রুশদিন ওয়া খায়র। অর্থ : হে আল্লাহ! এই মাসকে আমাদের জন্য নিরাপত্তা, ইমান, প্রশান্তি ও ইসলামসহ যোগে আনয়ন
করুন আমার ও তোমার প্রভু আল্লাহ। এই মাস সুপথ ও কল্যাণের। হিজরি সন হচ্ছে মুসলমানদের সন। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত এ সনের অনুসরণ করা। এ ক্ষেত্রে উদাসীনতা করা উচিত নয়। ইসলামী ফিকাহবিদরা চান্দ্রবর্ষের হিসাব রাখাকে মুসলমানদের জন্য ফরজে কিফায়া বলেছেন। অর্থাৎ কেউ কেউ এর হিসাব রাখলে সবার দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু সবাই যদি এ বিষয়ে উদাসীনতা দেখায় তাহলে প্রত্যেক মুসলমানকে গুণাহগার হতে হবে। চান্দ্রমাসের হিসাবের অনুসরণ নবী (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নত। যাদের অনুসরণ আমাদের জন্য পুণ্যময় ও কল্যাণকর আমল। আসুন, তাওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে পুরোনো বছরকে বিদায় দিয়ে ইবাদতের মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানাই। বিশ্বাস, আশা ও ভালোবাসা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাই। জীবনের অনন্ত যাত্রায় একে অন্যের সহযোগী ও কল্যাণকামী হই। হিজরি নতুন বছর বিশ্ববাসীর জন্য বয়ে আনবে ঐক্য, সম্প্রীতি, শান্তি-সৌহার্দ্য আর দূর হবে রক্তপাত-হানাহানি-এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমিন।
















