চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে আদালত চলাকালে এজলাস কক্ষে ব্যবসায়ী নুরুল কবিরকে (৪২) গলায় ছুরিকাঘাতে হত্যাচেষ্টার ঘটনার ২২ দিন পর এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মামলার বাকি আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন নুরুল কবির।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) জয়নাল আবেদীন সোহেল নামের ওই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল কবিরের নেতৃত্বে উপপরিদর্শক (এসআই) জোবাদুল ইসলাম ও নঈম রহমান পাঁচলাইশ থানাধীন ৭ নম্বর ওয়ার্ডের হাদুমাঝিপাড়া এলাকায় বিলের মাঝখান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে জয়নাল আবেদীন সোহেল বিলের মাঝখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
হত্যার উদ্দেশ্যে গলায় ছুরিকাঘাতের ঘটনায় বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় মামলা (নম্বর ১২ (৯) (২৬)) দায়ের করেন নুরুল কবির।
নুরুল কবির জানান, মামলা করার পর থেকেই আসামিরা তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অব্যাহত হুমকিতে জীবন রক্ষায় পালিয়ে বেড়ালেও পুলিশ বলছে, আসামিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে শেষ পর্যন্ত একজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
জানা গেছে, গত ৬ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টার দিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩’-এর এজলাস কক্ষে নুরুল কবির একটি মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জামিনের বিরোধিতা করার জন্য উপস্থিত হলে আসামিরা সংঘবদ্ধ হয়ে এ ঘটনা ঘটান। ঘটনার পরপরই বিচারকের নির্দেশে দায়িত্বে থাকা পুলিশ আহত নুরুল কবিরকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরদিন ৭ সেপ্টেম্বর নুরুল কবিরের স্ত্রী রুনা আক্তার রূপা (৩০) বাদী হয়ে ইলিয়াস হোসেন অপু, মো. ইমরান, মো. আনোয়ার, জয়নাল আবেদীন সোহেল, কুলসুমা আক্তার ও উর্মি আক্তারকে আসামি করে মামলা (নম্বর ১২ (৯) (২৬)) দায়ের করেন।
মামলা সূত্রে জানা যায়, পাঁচলাইশ থানাধীন হাদুমাঝিপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী নুরুল কবির স্থানীয় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, লুটপাট, হামলা ও চুরির ঘটনায় অন্তত চারটি মামলা দায়ের করেছিলেন। তিনি একটি মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জামিনের বিরোধিতা করার জন্য আদালতে উপস্থিত হলে আদালত চলাকালে অপর আসামিরা যোগসাজশে হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে ছুরিকাঘাত করেন। এ সময় তার সঙ্গে থাকা নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া এবং তার স্ত্রীকেও মারধর করা হয়।
নুরুল কবির বলেন, তার ওপর হামলাকারী ইলিয়াস হোসেন অপুসহ সব আসামি এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আসামিদের ভয়ে তিনি এখনো বাসায় থাকতে না পারলেও আসামিরা ঠিকই বাসায় রাতযাপন করেন। কিন্তু পুলিশ অজানা কারণে আসামিদের গ্রেপ্তার করছে না।
জানা গেছে, মোহাম্মদ নুরুল কবিরের সঙ্গে আসামিদের পূর্ববিরোধ রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় নুরুল কবির ও তার স্ত্রী রুনা আক্তার রূপা বাদী হয়ে পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলা নম্বর-৩ (১১) ২০২৪, মামলা নম্বর-৪ (৬) ২০২৬ ও মামলা নম্বর-২৩ (৬) ২০২৬ দায়ের করেন। এসব মামলা আদালতে বিচারাধীন এবং থানায় তদন্তাধীন রয়েছে।
এতে আসামিরা বাদীর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে পাঁচলাইশ থানাধীন হাদুমাঝিপাড়ার সাবের মাস্টারের বাড়ির অজিফা ম্যানশনে গত ২৮ আগস্ট জুমার নামাজ চলাকালে বাদীর অনুপস্থিতিতে অপু-সোহেলের নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি দল ডাকাতির উদ্দেশ্যে নুরুল কবিরের বাড়ির সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করে বাসায় ঢোকে। তারা কবিরের স্ত্রীকে হাত-পা বেঁধে বাথরুমে আটকে রেখে নগদ ৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা এবং স্বর্ণালংকার, ল্যাপটপসহ প্রায় ১০ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়।
ঘটনার পরপরই চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পাঁচলাইশ থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। ওই দিন সন্ধ্যায় নুরুল কবির থানায় ডাকাতির ঘটনায় এমরান, ফয়সাল, ইলিয়াস হোসেন অপু, জয়নাল আবেদীন সোহেল, আনোয়ার, রবিউল হাসান, জালাল আহমেদ পারভেজ এবং অজ্ঞাতনামা ৫-৬ জনকে আসামি করে এজাহার দেন। তবে পুলিশ তিন দিন পর চুরির মামলা (নম্বর ২৪(৮)২৬) গ্রহণ করে।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসায়ী নুরুল কবিরের বাড়িতে ২০২৪ সালে নগদ ১৪ লাখ টাকা চুরির ঘটনায় সন্ত্রাসী ইলিয়াস হোসেন অপুর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ২০২৫ সালের প্রথম দিকে তাহসিন হত্যা ও চুরির মামলা থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে ইলিয়াস হোসেন অপু নুরুল কবিরের কাছে সরাসরি ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দিলে মামলা তুলে না নেওয়া পর্যন্ত ডিশ-ওয়াইফাই ব্যবসায় বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেন।
তাদের দাবিকৃত চাঁদা না দেওয়ায় গত ১ জুন জয়নাল আবেদীন সোহেল ও ইলিয়াস হোসেন অপুর নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা নুরুল কবিরকে তুলে নিয়ে সোহেলের রিকশার গ্যারেজে আটকে রাখে। সেখানে দুই দিনের মধ্যে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে তাকে মারধর করা হয়। পরে তার কাছ থেকে নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ওই ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হলে সন্ত্রাসীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে পরদিন নুরুল কবিরের বাসার সামনে এসে তাকে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। এ সময় তার স্ত্রীকেও ব্যাপক মারধর করা হয়। ওই ঘটনায় আরও একটি মামলা দায়ের করা হলেও অজানা কারণে উল্লেখযোগ্য আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর থেকে সন্ত্রাসীরা নুরুল কবিরকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য প্রতিনিয়ত হুমকি দিতে থাকেন। একপর্যায়ে ডিশ-ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তার ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সন্ত্রাসীদের হামলার ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে নুরুল কবির অন্যত্র বসবাস করলেও তার স্ত্রী-সন্তানেরা বাসায় রয়েছেন। ওই আসামিদের বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও ডাকাতিসহ মোট ১১টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
















