চট্টগ্রাম : ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) জেনারেল হাসপাতালে চালু করা হয়েছে ‘ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট সেল’।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) চসিকের মেয়র শাহাদাত হোসেন এ সেলের উদ্বোধন করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘একটি মৃত্যুও আমাদের জন্য কাম্য নয়। ডেঙ্গু মোকাবিলায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন প্রতিরোধমূলক ও চিকিৎসামূলক—দুই ধরনের কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালনা করছে।’
‘চলতি বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর, জেলার উপজেলা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৮৮২ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন। এ পর্যন্ত মহানগরে চারজন, উপজেলা পর্যায়ে সাতজন এবং অন্যান্য জেলায় একজনসহ মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।’
মেয়র বলেন, ‘অতীতের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ সাধারণত বেশি থাকে। তাই এ দুই মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চসিকের মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ক্রাশ প্রোগ্রাম ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।’
‘আমরা ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে প্রিভেন্টিভ এবং কিউরেটিভ—দুই ধরনের কাজ করছি। লার্ভা ধ্বংসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) স্বীকৃত বিটিআই ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি এডাল্ট মশা নিয়ন্ত্রণেও নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’
চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে মেয়র বলেন, ‘২০২২ সালে মহানগর ও জেলা মিলিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৫৪৫ জন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৮৭ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জনে দাঁড়ায়। চলতি বছর এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৮৮২ জন।’
মৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরে মেয়র বলেন, ‘২০২২ সালে ডেঙ্গুতে ৪১ জন, ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ১০৭ জন, ২০২৪ সালে ৪৫ জন এবং ২০২৫ সালে ২৭ জন মারা গেছেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।’
তবে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে মহানগরে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান।
ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করতে বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করে মেয়র বলেন, ‘আমি গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড পরিদর্শন করেছি। রোগীদের চিকিৎসা ও সেবার মান আরও উন্নত করার জন্য চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রোগীদের প্রতি আরও আন্তরিক ও যত্নশীল হওয়ার জন্যও চিকিৎসকদের অনুরোধ করেছি।’
চসিক জেনারেল হাসপাতালে চালু হওয়া ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট সেলে পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্য মোট ১৫টি শয্যা রাখা হয়েছে জানিয়ে মেয়র বলেন, ‘প্রয়োজন হলে শয্যা সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু শনাক্তকরণে এনএসআই অ্যান্টিজেন পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হচ্ছে।’
‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চসিক জেনারেল হাসপাতালে মোট ৮২ জনের ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জনের ডেঙ্গু পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। গত আট মাসে শনাক্ত হয়েছেন ১৩ জন এবং চলতি সেপ্টেম্বর মাসে সাতজন।’
নগরবাসীকে সতর্ক করে মেয়র বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু সিটি কর্পোরেশনের একার দায়িত্ব নয়। নগরবাসীর সহযোগিতা ছাড়া এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র, কনটেইনার, নির্মাণসামগ্রীসহ যেসব স্থানে পানি জমতে পারে, সেগুলো দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে।’
‘বাড়ির ছাদ, বারান্দা ও ফুলের টব নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। একই সঙ্গে এসির পানি জমার স্থানও পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও যাতে তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সেদিকে সবাইকে নজর দিতে হবে।’
ডেঙ্গু আক্রান্তদের পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে মেয়র বলেন, ‘জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পর্যাপ্ত পানি, ডাবের পানি, ওরস্যালাইনসহ তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।’
শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে রোগীর অবস্থা দ্রুত জটিল হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
মেয়র বলেন, ‘সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সময়। অতীতের পরিসংখ্যানও সেটিই বলছে। তাই এই সময়ে আমাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। সিটি কর্পোরেশন তার দায়িত্ব পালন করছে, এখন নগরবাসীকেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’
উদ্বোধন শেষে মেয়র ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করেন।
















