চট্টগ্রাম : গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ ও টেকসইকরণে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা ও করণীয় বিষয়ে চট্টগ্রামে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (৪ জুলাই) সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসন চট্টগ্রাম এ সভার আয়োজন করে।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ তৃতীয় পর্যায় প্রকল্পের জাতীয় প্রকল্প পরিচালক সুরাইয়া আখতার জাহান।
চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক (উপসচিব) গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসানের পরিচালনায় সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। স্বাগত বক্তব্য দেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
সভায় সুরাইয়া আখতার জাহান বলেন, ‘গ্রাম আদালতের মূল উদ্দেশ্য হলো পারিবারিক ও স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধগুলো দ্রুত, সহজে ও স্বল্প খরচে নিষ্পত্তির মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা। ভাইয়ে-ভাইয়ে কিংবা প্রতিবেশীদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ যদি গ্রাম আদালতের মাধ্যমে সমাধান করা যায়, তবে পারস্পরিক ক্ষোভ কমে এবং সমাজে স্থায়ী শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘গ্রাম আদালতকে আরও কার্যকর ও টেকসই করতে ‘এক্সিট প্ল্যান’-এর আওতায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ানোর একটি অন্যতম মাধ্যম হলো এই গ্রাম আদালত। তাই চেয়ারম্যানদের এ বিষয়ে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’
সুরাইয়া আখতার উল্লেখ করেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা (ইউএনও) মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে নিয়মিত গ্রাম আদালতের শুনানি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম তদারকিতে ‘বিট পুলিশ’ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই আদালতকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকারের একটি পৃথক বাজেট কোড তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এমনকি সরকারি কর্মমূল্যায়নেও এখন গ্রাম আদালতের পারফরম্যান্সকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের উদ্যোগে নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জন্য গ্রাম আদালত বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে। একই সাথে গ্রাম আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নারী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টিতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, ‘গ্রাম আদালত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তাই প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। অতীতের গ্রাম পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ইতিবাচক দিকগুলোকে কাজে লাগিয়ে গ্রামীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গ্রাম আদালত দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
তিনি উল্লেখ করেন, উচ্চ আদালতের মামলার চাপ কমাতে সরকার গ্রাম আদালতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।’
বিচারকার্য পরিচালনাকারীদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক বা বিশেষ কোনো পরিচিতির ব্যবস্থা করা যায় কি না—তা ভেবে দেখার সুপারিশ করেন মো. জিয়াউদ্দীন।
পাশাপাশি উচ্চ আদালতে যাওয়ার আগে ইউএনও অফিসে একটি ‘চেকলিস্ট’ রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মত দেন তিনি।
জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘সরকার দীর্ঘদিন ধরে গ্রাম আদালত কার্যক্রমকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছে। সময়ের সাথে গ্রামগুলোর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও গ্রাম আদালতের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়নি; বরং প্রান্তিক মানুষের সহজ, দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে গ্রাম আদালত এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার যে মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে, তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে তখনই, যখন দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা যাবে।’
সরকার গ্রাম আদালতকে স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করছে উল্লেখ করে জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘জেলা ও উপজেলা প্রশাসন আরো আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে, যাতে গ্রাম আদালত কার্যক্রম আরও সক্রিয় ও কার্যকর হবে। সাধারণ মানুষ যেন ছোটখাটো বিরোধ নিয়ে দূরের আদালত যেতে বাধ্য না হয়, সে জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে গ্রাম আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করতে হবে। মানুষকে গ্রাম আদালতের সেবা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে; তাহলেই এই উদ্যোগ দেশের জন্য বাস্তব সুফল বয়ে আনবে।’
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ‘উন্নত দেশের সঙ্গে আমাদের একটি বড় পার্থক্য হলো—সেখানে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী, আর আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু একটি ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে ব্যক্তিনির্ভরতা কমিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। গ্রাম আদালতও সেই প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান। সভায় অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগ চট্টগ্রামের পরিচালক মনোয়ারা বেগম, যুগ্ম সচিব রোঁকসানা খান, উপসচিব (আইন-১) ড. শাহেদ মোস্তফা। উপস্থিত ছিলেন জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ চট্টগ্রাম সুব্রত দাশ, সমাজ সেবা অধিদদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক, যুব উন্নয়ন অধিদদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবুল বাসার, বাংলাদেশ বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক শাহীন আকতার, গ্রাম আদালত প্রকল্পের বাস্তবায়ন সহযোগী সংস্থা ইপসার পরিচালক (সামাজিক উন্নয়ন) নাছিম বানু প্রমুখ।
















