আল্লাহ বছরের বিভিন্ন মৌসুমকে বিভিন্ন ফসলের জন্য অপেক্ষাকৃত উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন। যদি সেই নির্দিষ্ট মৌসুমে তার উপযোগী ফসলের চাষ করা হয় তবে অধিক লাভবান হওয়া যায়। তেমনি করে বছরের কোন কোন মাস ও তার দিবা রাত্রিকেও তিনি ইবাদতের জন্যে বিশেষভাবে বরকতময় ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করে রেখেছেন। এসব বরকতময় সময়গুলোতে সামান্য মেহনত করে যে বিশাল প্রতিদানের অধিকারী হওয়া সম্ভব, তা অন্য সময়ে অধিক মেহনত করেও অর্জন করা সম্ভব নয়। এই ধরনের বরকতময় সময়গুলোর মধ্য হতে পবিত্র রমজান সর্বশ্রেষ্ঠ।
হযরত উবায়দা ইবনে সামেত (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসের ফজিলত ও তার গুরুত্ব বর্ণনা প্রসঙ্গে আমাদের বলেন, ‘‘রমজান একটি বরকতের মাস। এ মাসে আল্লাহ তোমাদের দিকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন এবং তোমাদের উপর খাস রহমত অবতীর্ণ করেন। তিনি তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন। তোমাদের দোয়া কবুল করেন। আর তাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে তোমরা নেক কাজ করার জন্য যে প্রতিযোগিতা করে থাক, তিনি আনন্দের সাথে তা দেখে থাকেন, আল্লাহ তার ফেরেশতাদের সাথে তোমাদের বিষয়ে গৌরব করে থাকেন। ফেরেশতারা মানুষকে সৃষ্টি করার প্রস্তাবের বিরোধীতা করেছিলেন। তাই আল্লাহ মানুষের নেক কাজের প্রতিযোগিতা দেখায়ে ফেরেশতাদের সম্মুখে গৌরব করেন।’’
অতঃপর মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা সাধ্যমত আল্লাহকে নিজ নিজ নেকী দেখাও। জেনে রাখ, সে ব্যক্তি বড়ই হতভাগ্য, যে ব্যক্তি এ পবিত্র মাসে আল্লাহর রহমত হতে বঞ্চিত থাকে।’ (তারগীব)।
রমজান মাস খুবই ফজিলতপূর্ণ। এ মাসের যে কোন ইবাদতের ছওয়াব অন্যান্য মাসের অপেক্ষা ৭০ গুণ বেশী। এ মাসে আল্লাহ পবিত্র কোরআন শরীফ অবতীর্ণ করেছেন, যা মানব জাতির জন্য পথ প্রদর্শক, আর এর মধ্যেই হক্ক ও বাতিলের স্পষ্ট দলিল রয়েছে। রমজানের প্রতিটি নফল ইবাদতের মর্যাদা ফরজের সমতুল্য। এ মাসে আল্লাহ উম্মতে মুহম্মদীর (সা.) প্রতি রোজাকে ফরজ করেছেন।
এ মাসের এমন একটি রাত আছে, যে রাত হাজার মাসের চেয়েও অতি উত্তম রাত বলে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন। হাদীসে কুদসীতে এরশাদ হচ্ছে ‘ক্বালাল্লাহু তায়ালা আচ্ছাওমুলী ওয়া আনা আজযীবিহী’।
অর্থ- আল্লাহ এরশাদ করেন রোজা শুধু আমারই সন্তুষ্টির জন্য এবং আমি নিজেই তার প্রতিদান দেন। শুধু কোরআন শরীফই এ মাসে অবতীর্ণ হয়নি বরং এর পূর্বের অন্য আসমানী কিতাবগুলো এ মাসেই অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন আমার উম্মতকে রমজান মাসে এমন পাঁচটি খাস নেয়ামত দান করা হয়েছে, যা পূর্বের কোন উম্মতকে দান করা হয়নি।
সে নিয়ামতগুলো হচ্ছে রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের চেয়েও অধিক সুগন্ধি বলে বিবেচিত; রোজাদারের জন্যে পানির মাছ ও গর্তের পিপিড়িকাসহ সকল মাগলুকাত আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন; রমজান মাসে প্রতিদিন নতুন নতুন সাজে বেহেশতকে সাজানো হয়, রোজাদার নেক্কার বান্দাদের জন্যে; রমজান মাসে শয়তানকে বন্দী করে রাখা হয়। যার কারণে এ মাসে পাপের মাত্রা কমে যায়; এ মাসের শেষ রাতে নেক্কার রোজাদার বান্দাদের দোযখ থেকে মুক্তির কথা ঘোষণা করা হয়।
ফলে বলা যায় যে, রমজান মাস খুবই পবিত্র ও বরকতময়। এই মাসের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষায় গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রমজানের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষায় গণমাধ্যম গণসচেতনতা গড়ে তোলে। রমজানের তাৎপর্য, রোজার বিধান, স্বাস্থ্যবিধি, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচার করলে মানুষ সচেতন হয়। টেলিভিশন, পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্ভরযোগ্য আলেম, গবেষক ও চিকিৎসকদের মতামত প্রকাশ করলে রোজা সম্পর্কিত বিভ্রান্তি কমে। অনেক সময় ভুল তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। গণমাধ্যম যদি যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য প্রচার করে, তাহলে পবিত্র মাসেও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা রমজানের পরিবেশ সুরক্ষায় অত্যন্ত জরুরি।
ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও ইবাদতের সঠিক উপস্থাপন গুরুত্বপূর্ণ। সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি, তারাবির নামাজের সম্প্রচার, কোরআন তেলাওয়াত ও ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠান মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত করে। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম রমজানভিত্তিক বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করে থাকে, যা মানুষের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি জোরদার করে।
অশালীন ও অনৈতিক কনটেন্ট থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
রমজান সংযমের মাস। এ সময় অশালীন বিনোদন, সহিংসতা বা ভোগবাদী বিজ্ঞাপন সম্প্রচার রমজানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গণমাধ্যম যদি দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর জন্য চটকদার বা অনুপযুক্ত অনুষ্ঠান প্রচার করে, তাহলে তা সামাজিক মূল্যবোধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ মাসে অনুষ্ঠান নির্বাচন ও বিজ্ঞাপন প্রচারে বিশেষ নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা উচিত।
দ্রব্যমূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। রমজান এলেই প্রতি বছর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে কারসাজি, মজুতদারি বা ভেজাল পণ্যের তথ্য তুলে ধরলে প্রশাসন সক্রিয় হয় এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা সতর্ক হয়। সংবাদপত্র ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত বাজারদর প্রকাশ করলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়। এতে রমজানের সামাজিক ন্যায়বোধ ও সহমর্মিতার চর্চা শক্তিশালী হয়।
দান ও মানবিক কার্যক্রম প্রচারে গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। রমজানে যাকাত, ফিতরা ও দান-সদকার গুরুত্ব অপরিসীম। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ের উদ্যোগ গণমাধ্যমে প্রচার পেলে মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়। দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের কষ্ট ও প্রয়োজন তুলে ধরলে বিত্তবানরা সাহায্যে এগিয়ে আসেন। এভাবে গণমাধ্যম সমাজে সহমর্মিতার সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।
শিশু-কিশোরদের উপযোগী ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান তৈরি করা দরকার। রমজান তাদের জন্য শিক্ষার সময়। উপযুক্ত গল্প, কুইজ, নাটিকা ও অ্যানিমেশন প্রচার করলে তারা ধর্মীয় মূল্যবোধ সহজভাবে শিখতে পারে।
গণমাধ্যমে স্বাস্থ্যসচেতনতা ও সঠিক জীবনযাপন নিয়ে পরামর্শ প্রচার প্রয়োজন। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের পরামর্শ প্রচার করলে মানুষ সচেতন হয় এবং সুস্থভাবে রোজা পালন করতে পারে। এতে রমজানের ইবাদত ও দৈনন্দিন কর্মজীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের মধ্যে সম্পর্কে গড়ে তুলতে এমনকি যে কোন বিষয়ে জনগণের মতামত তৈরিতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বলা যায়, রমজান মাসের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা সবচেয়ে বেশী।
লেখক : শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক, ঢাকা।
















