আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞী, উপমহাদেশখ্যাত শিল্পী শেফালী ঘোষ এখনও ফুরিয়ে যাননি। তার সুখ্যাতি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। আজও বিভিন্ন স্টেজ প্রোগ্রামে শিল্পীদের শেফালী ঘোষের গান গেয়ে শোনাতে হয়। এখনো তার নামের ওপর ক্যাসেট ও অ্যালবাম বিক্রি হয়। শেফালী ঘোষকে নিয়ে রূপম চক্রবর্তী নির্মাণ করেছেন একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম। তার গাওয়া গানের ভিডিও সিডিও বাজারে ব্যবসাসফল হয়েছে। মৃত্যুর পরও তাঁকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে আরও বেশ কয়েকটি গানের সিডি।
শুরু থেকেই এপার-ওপার বাংলায় শেফালী ঘোষের জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ পর্যন্ত তিনি কোনো জাতীয় পুরস্কার কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। চট্টগ্রামে অবস্থানের কারণেই তিনি অবহেলার শিকার হয়েছেন। বড় বড় অনুষ্ঠানেও তাঁকে অনেক সময় আমন্ত্রণ জানানো হতো না। শ্যাম সুন্দর ও শেফালী ঘোষের জুটি আঞ্চলিক গানের জগতে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে; এমন জনপ্রিয় জুটি আজও বিরল।
আঞ্চলিক গানের কিংবদন্তি শিল্পী শেফালী ঘোষের ৩১ ডিসেম্বর ১৯তম প্রয়াণ দিবস। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি আমাদের প্রিয় এই শিল্পীকে।
১৯৪৫ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার কানুনগোপাড়া গ্রামে শেফালী ঘোষের জন্ম। তার পিতা কৃষ্ণ গোপাল ঘোষ। শৈশব থেকেই তিনি সংগীতের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েন। ফলে স্কুলজীবন থেকেই পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়েন এবং আর সেভাবে এগিয়ে যেতে পারেননি।
দেশের বিভিন্ন জায়গার পাশাপাশি তিনি বিদেশের বহু দেশে সংগীত পরিবেশন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর, লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী রয়েল আলবার্ট হল, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েত, কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, জাপান ও জর্ডান—সবখানেই তিনি সংগীত পরিবেশন করে প্রশংসিত হয়েছেন। বিশেষ করে রয়েল আলবার্ট হলে তাঁর গান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দারুণ সাড়া ফেলে।
শেফালী ঘোষের গাওয়া দুই শতাধিক অডিও ও ভিডিও অ্যালবাম বাজারে রয়েছে। কলকাতা ও লন্ডন থেকেও তাঁর ক্যাসেট প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে শুধু গান গেয়ে তৃপ্ত হতে চাননি; চট্টগ্রামের নিজস্ব সংস্কৃতি ধারণ করেই কাজ করতে গর্ববোধ করতেন। কারণ, চট্টলার আঞ্চলিক গান আজ ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বাঙালিদের কাছে সমান জনপ্রিয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শেফালী ঘোষ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন শব্দসৈনিক ছিলেন। তিনি বেতার ও টেলিভিশনের বিশেষ শ্রেণির শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পান। সংগীত শিক্ষায় তাঁর গুরু ছিলেন বাবু তেজেন সেন, শিব শংকর মিত্র, জগদানন্দ বড়ুয়া, নীরদ বরণ বড়ুয়া, মিহির নন্দী ও গোপাল কৃষ্ণ চৌধুরী প্রমুখ। পরবর্তীতে এমএন আখতার, এম এ কাশেম, আবদুল গফুর হালী ও সৈয়দ মহিউদ্দিনের কাছ থেকে আঞ্চলিক গানের শিক্ষা নেন।
সংগীত জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় সহায়ক ছিলেন স্বামী ননী গোপাল দত্ত। গান বাছাই, সুর ও গানের কথার ক্ষেত্রে তিনি সবসময় নিপুণ সহায়তা করেছেন।
শেফালী ঘোষের জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে— ওরে সাম্পান ওয়ালা, আইওরে আইওরে কুডুম, লাল মিয়ার বাড়ি, থিয়া থিয়া ও লেদুনী, ছোড ছোড ঢেউ তুলি, আসকার দিঘীর, বাইক্কা টেয়া দে, মাইট্টা কলসি, মালকা বানুর দেশেরে, নাইয়র নিবা কইসহ আরও অনেক গান। এসব গানে আঞ্চলিক জীবনের মাটি ও মানুষের অনুভূতি নিভৃত ও বাস্তবভাবে ফুটে উঠেছে, যা সাধারণ মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করে।
শিল্পী জীবনে শেফালী ঘোষ কখনো পারিশ্রমিক নিয়ে দরকষাকষি করেননি। আয়োজক যে সম্মানী দিতেন, সেটাই গ্রহণ করতেন। এ কারণে কখনো কখনো তিনি আর্থিকভাবে বঞ্চিত হয়েছেন। তবুও তিনি বলতেন, “কে আমাকে কত টাকা দিল, তা আমার কাছে বড় নয়। আমার গান মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে—এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় গান গেয়ে যে এমন জনপ্রিয়তা পাওয়া সম্ভব, তা তিনি নিজেও ভাবেননি। তিনি প্রায়ই বলতেন, “আমার চট্টগ্রামই আমার অহংকার।”
২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেফালী ঘোষ আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান। তার শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি। ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এই অমর শিল্পীকে।
চট্টগ্রামের সব শিল্পী, সুরকার, গীতিকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের পক্ষ থেকে রইল তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: সাংবাদিক ও গীতিকার
















