পবিত্র কোরআনের দ্বিতীয় ও দীর্ঘতম সূরা আল-বাকারাহ মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ও পথনির্দেশনা। পবিত্র কুরআনের দীর্ঘতম অধ্যায় ‘সূরা আল-বাকারাহ’ কেবল প্রাচীন কোনো ধর্মগ্রন্থের অংশ নয় বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব, পারিবারিক বন্ধন, সমাজভাবনা ও রাষ্ট্রপরিচালনার এক অমলিন দিকনির্দেশনা। মদিনায় অবতীর্ণ এ সূরার গহিন থেকে যদি আমরা আমাদের প্রতিদিনের পথচলার জন্য মূল অনুশাসন বেছে নিই তবে তা আমাদের জীবনের ক্যানভাস এক নিমেষে বদলে দিতে পারে। সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত ‘আয়াতুল কুরসি’ নামে পরিচিত। এটি কোরআন শরিফের প্রসিদ্ধ আয়াত। এ সুরার শেষ দুটি আয়াতের (২৮৫-২৮৬) রয়েছে বিশেষ ফজিলত ও তাৎপর্য।
হজরত আলী (রা.) বলেছেন, আমার মতে যার সামান্য বুদ্ধিজ্ঞান আছে সে এ দুটি আয়াত পাঠ করা ছাড়া নিদ্রা যাবে না। এ আয়াত দুটো নিয়মিত পড়লে বিপদ-আপদ দূরে থাকে জান্নাতের পথও সুগম হয়। সুরা আল-বাকারার পুরো আয়াতে আল্লাহর একত্ববাদ, মর্যাদা ও গুণের বর্ণনা থাকায় আল্লাহ-তাআলা এ আয়াতের মধ্যে অনেক ফজিলত রেখেছেন।
তাকওয়া :
অন্তরের কম্পাস ও সংশয়হীন পথচলা : জীবনের কুয়াশাচ্ছন্ন মোড়ে দাঁড়িয়ে কোনটা ভালো, আর কোনটা মন্দ, তা চেনার একমাত্র অলৌকিক শক্তি হলো ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি। অন্তরে পরম করুণাময়ের ভয় ও ভালোবাসা থাকলে জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে এক পরম স্থিরতা চলে আসে। আর কুরআনের আলো কেবল তাদের হৃদয়েই কার্যকর হয়, যাদের অন্তরে এই তাকওয়ার সলতে জ্বলছে। এ সেই কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই এটি মুত্তাকিদের (তাকওয়াবানদের) জন্য পথপ্রদর্শক। [সূরা আল-বাকারাহ : ২]
শয়তানের সূক্ষ্ম ফাঁদ ও তওবার আকুলতা :
অন্যায় বা পাপ কখনোই এক লাফে এসে আমাদের গ্রাস করে না শয়তান অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ছোট ছোট মিষ্টতার প্রলোভন দিয়ে মানুষকে ভুল পথে টানে। ভুল করা মানবের স্বাভাবিক প্রবণতা কিন্তু ইবলিসের মতো অহংকারে অন্ধ না হয়ে হজরত আদমের (আ.) মতো নতশিরে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়াই মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য। হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে তা থেকে আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কর না নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। [সূরা আল-বাকারাহ : ১৬৮]
ধৈর্য ও সালাত :
ঝড়ের রাতে নোঙর ফেলার আশ্রয় : কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মানুষ যখন দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলে তখন ধৈর্য ও সালাতই তাকে অটল থাকার শক্তি দেয়। জীবনের বিপদ যতই পাহাড়সম হোক না কেন সালাতের সেজদায় নিজের কষ্ট ঢেলে দেওয়া এবং পরম ধৈর্যের সঙ্গে সময়ের মুখোমুখি হওয়ার নামই আসল ইমান। হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। [সূরা আল-বাকারাহ : ১৫৩]
ক্ষয়ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে অনন্ত শান্তির বিশ্বাস : প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কিংবা ধনসম্পদের ক্ষয়ে হৃদয় যখন দুমড়ে-মুচড়ে যায়, তখন একটি গভীর বিশ্বাসই মানুষকে মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে দেয়, এই দুনিয়ায় কিছুই চিরস্থায়ী নয়। আমাদের যা কিছু আছে এবং আমরা নিজেরাও এক পরম সত্তার দিকে ধাবমান। এ উপলব্ধি দুঃখের আগুনে পোড়া অন্তরে শীতল জল ঢেলে দেয়। তারা কোনো বিপদে পতিত হলে বলে : নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চিতভাবেই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। [সূরা আল-বাকারাহ : ১৫৬]
সম্পর্কের সম্মান ও বিচ্ছেদের মাঝেও সৌজন্য :
দাম্পত্য জীবন হলো ভালোবাসার এক সুবাসিত বন্ধন। কিন্তু কখনো যদি অমিলের কারণে সেই বন্ধন ছিঁড়তেও হয় তবুও ইসলাম তাতে কোনো কাদা ছোড়াছুড়ির অনুমতি দেয় না। বিচ্ছেদের বিষাদময় মুহূর্তেও একে অপরের প্রতি সম্মান সৌজন্য ও উদারতা বজায় রাখার শিক্ষা দেয় সূরা আল-বাকারাহ। আর তোমরা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি ও সৌজন্যের কথা ভুলে যেও না। [সূরা আল-বাকারাহ : ২৩৭]
শোষণহীন অর্থনীতি :
সুদের অভিশাপ থেকে মুক্তি :
অন্যের অসহায়ত্ব ও অভাবকে পুঁজি করে নিজের পকেট ভারী করা চরম এক সামাজিক অপরাধ। ইসলাম সুদের মতো শোষণমূলক ব্যবসাকে কঠোরভাবে বর্জন করে করজে হাসানা ও দানের মাধ্যমে এক মানবিক অর্থনীতি গড়ে তোলার তাগিদ দেয়। সম্পদ যেন কেবল অর্থশালীদের হাতে ঘুরপাক না খায় তার চমৎকার সুরাহা এতে রয়েছে। আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম। [সূরা আল-বাকারাহ : ২৭৫]
লেনদেনের শতভাগ স্বচ্ছতা ও হিসাব :
ভালোবাসা আর বিশ্বাসের সুতো দিয়ে সম্পর্কের ভিত গড়া যায় কিন্তু আর্থিক লেনদেনের ভিতে চাই শতভাগ হিসাবের স্পষ্টতা। পরবর্তী সময়ে যেন কোনো ভুল বোঝাবুঝি সন্দেহ বা অন্যায়ের সুযোগ তৈরি না হয় সেজন্য যে কোনো ছোট-বড় দেনা-পাওনা লিখিত রাখা এবং সাক্ষী রাখার কঠোর অনুশাসন দেওয়া হয়েছে। হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পরের মধ্যে ঋণের লেনদেন কর তখন তা লিখে রাখ। [সূরা আল-বাকারাহ : ২৮২]
বরকতের দরজা ও জাদু প্রতিরোধকারী : সুরা বাকারা তিলাওয়াত করলে জীবনে অভাবনীয় বরকত আসে, রিজিক বৃদ্ধি পায়। কুফরি কালাম, বদনজর ও জাদুর প্রভাব দূরে সরে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন তোমরা সুরা বাকারা শিক্ষা করো। কারণ এটি গ্রহণ করার মাঝে রয়েছে বরকত এবং বর্জন করার মাঝে রয়েছে অনুতাপ। কোনো বাতিলপন্থী বা জাদুকর এর মোকাবিলা করার ক্ষমতা রাখে না।
সুরা বাকারার শেষ দু্ইটি আয়াত :
আমানার রাসুলু বিমা উনঝিলা ইলাইহি মিররাব্বিহি ওয়াল মুমিনুন। কুল্লুন আমানা বিল্লাহি ওয়া মালা ইকাতিহি ওয়া কুতুবিহি ওয়া রুসুলিহি লা নুফাররিকু বাইনা আহাদিমমির রুসুলিহি। ওয়া কালু সামিনা ওয়া আতানা গুফরানাকা রাব্বানা ওয়া ইলাইকাল মাসির। লা ইউকাল্লিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা উসআহা-লাহা মা কাসাবাত ওয়া আলাইহা মাকতাসাবাত-রাব্বানা লা তুআখিজনা ইন-নাসিনা আও আখতানা-রাব্বানা ওয়া লা তাহমিল আলাইনা ইসরান কামা হামালতাহু আলাল্লাজিনা মিং ক্বাবলিনা- রাব্বানা ওয়া লা তুহাম্মিলনা মা লা তাকাতা লানা বিহি-ওয়াফু আন্না ওয়াগফিরলানা ওয়ারহামনা-আংতা মাওলানা ফাংসুরনা আলাল কাওমিল কাফিরিন। (সুরা বাকারা : আয়াত ২৮৫-২৮৬)
দ্বিতীয় সুরা বাকারার শেষ দুটি আয়াতের রয়েছে বিশেষ ফজিলত ও তাৎপর্য। রাসুলুল্লাহকে (সা.) এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেছিলেন হে আল্লাহর রাসুল কোরআনের কোন সুরা সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান ? তিনি বললেন সুরা ইখলাস। এরপর ব্যক্তিটি আবার প্রশ্ন করলেন কোরআনের কোন আয়াতটি মর্যাদাবান ? তিনি বললেন আয়াতুল কুরসি। এরপর লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলেন হে আল্লাহর নবী আপনি কোন আয়াতটি পছন্দ করেন যাতে আপনার উম্মত লাভবান হবে। নবীজি (সা.) বললেন সুরা বাকারার শেষ দুটি আয়াত। সুরা বাকারার শেষ আয়াত দুটি নিয়ে হাদিসে আরও অনেক ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে।
এ দুটি আয়াতের ফজিলত প্রসঙ্গে নবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি রাতে এ দুটি আয়াত পাঠ করবে তার জন্য এটাই যথেষ্ট। আবু মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেছেন যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রাতের বেলা আয়াত দুটি তিলাওয়াত করবে তার জন্য এ আয়াত দুটোই যথেষ্ট। অর্থাৎ রাতে কোরআন মজিদ তিলাওয়াত করার যে হক রয়েছে কমপক্ষে সুরা বাকারার শেষ দুটি আয়াত তিলাওয়াত করলে তার জন্য তা যথেষ্ট।
হজরত আলী (রা.) বলেছেন, আমার মতে যার সামান্য বুদ্ধিজ্ঞান আছে সে এ দুটি আয়াত পাঠ করা ছাড়া নিদ্রা যাবে না। এ আয়াত দুটো নিয়মিত পড়লে বিপদ-আপদ দূরে থাকে জান্নাতের পথও সুগম হয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না নিশ্চয়ই শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায় যে ঘরে সুরা বাকারা পাঠ করা হয়। অন্য এক হাদিসে এসেছে যে ঘরে পর পর তিন রাত সুরা বাকারার শেষ দুটি আয়াত পাঠ করা হয় শয়তান সেই ঘরের ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারে না। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যখন আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় নিয়ে যাওয়া হয় তখন তিনটি জিনিস দান করা হয় : ১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, ২. সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, ৩. উম্মতদের মধ্যে যারা শিরক করে না তাদের কবিরা গুনাহ মাফ হওয়ার সুসংবাদ।
জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় মনে রাখুন আমরা ভবিষ্যৎ জানি না কিন্তু ভবিষ্যতের মালিককে জানি। তাই হতাশা নয়, ভয় নয় বরং আল্লাহর উপর অটল ভরসা রাখুন। হজরত ইউসুফের (আ.) মতো পাপ থেকে দূরে থাকুন হজরত মুসার (আ.) মতো সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে যান। যখন আপনার
ভরসার কেন্দ্র আল্লাহ হন, তখন বন্ধ দরজাও খুলে যায়, অন্ধকার পথেও আলো জ্বলে ওঠে আর অসম্ভব বলে মনে হওয়া বিষয়ও তার ইচ্ছায় সম্ভব হয়ে যায়। আল্লাহর উপর ভরসা করুন কারণ যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, সে কখনও একা নয়। সূরা আলে ইমরান আমাদের শেখায় যে বিপদে ধৈর্য হারানো যাবে না এবং আকিদাহ বা বিশ্বাসের প্রশ্নে কখনো আপস করা যাবে না। এটি আহলে কিতাব ও মুসলমান উভয়ের জন্য একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা, যেখানে তাওহিদ ও রিসালাতের সঠিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সুরা বাকারার বিভিন্ন আয়াতে এমন কিছু অর্থবহ ও হৃদয়স্পর্শী দোয়া রয়েছে যা মুমিনের আত্মিক প্রশান্তি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম। দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করা উচিত।
















