চট্টগ্রাম : বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) কর্তৃক আয়োজিত জাহাজভাঙা শিল্প সেক্টরে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অর্ধবার্ষিক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন উপস্থাপন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (২৯ জুন) সকাল ১০টায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় ইপসার এইচআরডি সেন্টারে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্তের সভাপতিত্বে এবং বিলস চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সমন্বয়ক ফজলুল কবির মিন্টুর সঞ্চালনায় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সীতাকুণ্ড উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন।
সভায় বিশেষ অতিথি ও আলোচক ছিলেন বিলস এলআরএসসি সেন্টার কো-অর্ডিনেশন কমিটির চেয়ারম্যান এএম নাজিম উদ্দিন, সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলতাপ হোসেন, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা তজাম্মল হোসেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা লুতফুন্নেসা বেগম, সাংবাদিক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্য দিদারুল আলম চৌধুরী, ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের সদস্য মো. আলী, মো. ইদ্রিস, মানিক মণ্ডল, জামাল উদ্দিন প্রমুখ।
সভায় আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘জাহাজভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে এই শিল্পের টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।’
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিলসের এই অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন মালিক, শ্রমিক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করবে এবং শিল্পে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে।
সভায় বিলস চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সমন্বয়ক ফজলুল কবির মিন্টু ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়কালের দুর্ঘটনা বিষয়ক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওই সময়ে জাহাজভাঙা শিল্পে মোট ২৮টি দুর্ঘটনায় ৩ জন শ্রমিক নিহত, ১০ জন গুরুতর আহত এবং ১৫ জন মাঝারি আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২১টি দুর্ঘটনা দিনে এবং ৭টি রাতে সংঘটিত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দুর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে এপ্রিল মাসে। দুর্ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশ ঘটেছে গার্ডার বা ভারী বস্তু পড়ে যাওয়া, ক্রেন-হুক-ওয়্যারজনিত দুর্ঘটনা এবং গ্যাস ও অগ্নিকাণ্ড-সংক্রান্ত কারণে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কাটারম্যান, কাটার হেলপার, ক্রেন হেলপার, ওয়্যার গ্রুপ, ফিটারম্যান ও লোডিং গ্রুপের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন। দুর্ঘটনার পেছনে অনিরাপদ আচরণ, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিপি) অভাব, তদারকির ঘাটতি ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে হংকং কনভেনশন, আইএলও নির্দেশিকা ও বাসেল কনভেনশন বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে পিপিপির বাধ্যতামূলক ব্যবহার, গ্যাস টেস্ট, পারমিট টু ওয়ার্ক, নিরাপদ ক্রেন পরিচালনা, নিয়মিত টুলবক্স মিটিং ও জরুরি মহড়াসহ বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়।
এছাড়া শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, ঝুঁকি রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু, নিরাপদ কর্মপদ্ধতি অনুসরণ এবং মালিক ও সরকারের প্রতি নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কার্যকর তদারকি, আইন প্রয়োগ ও প্রতিটি দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
সভার বক্তারা বলেন, ‘প্রতিটি কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু শ্রমিকের অধিকার নয়, বরং শিল্পের টেকসই উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত।’
















