চট্টগ্রাম : স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ‘চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং চলমান কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নগরীর ৮০-৯০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমে আসবে।’
শনিবার (১৬ মে) বিকালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ১৯ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সভায় শাহে আলম আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সম্প্রতি আমি চট্টগ্রামে এসে জলাবদ্ধতা, খাল খনন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা সরেজমিনে পরিদর্শন কররি। এ সময় মেয়রের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়, যা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও চান চট্টগ্রামের মানুষ যেন জলাবদ্ধতার কষ্ট থেকে মুক্তি পায়। একেবারে শতভাগ সমাধানের নিশ্চয়তা না দিলেও আমরা দৃঢ়ভাবে কাজ করছি।’
‘নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে বিভিন্ন খাল ও নদীর সংযোগস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। খালের মুখগুলোতে ড্রেজিং ও পরিষ্কার কার্যক্রম যথাযথভাবে হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।’
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যাকে অত্যন্ত ক্রিটিক্যাল উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান, জোয়ার ভাটার প্রভাব ও অতিবৃষ্টির কারণে বিষয়টি প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। এ জন্য বিভিন্ন স্থানে আধুনিক স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে পানির চাপ অনুযায়ী গেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলবে ও বন্ধ হবে। এছাড়া খালের পাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ এবং ময়লা আবর্জনা রোধে নেটিং ব্যবস্থাও চালু করা হবে।’
নগরবাসীকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘খালে ময়লা না ফেলে নির্ধারিত স্থানে ফেলতে হবে এবং সিটি কর্পোরেশন তা সংগ্রহ করবে।’
সাংবাদিকদেরও সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।
‘পানি উন্নয়ন বোর্ড, সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সব সংস্থা একসঙ্গে কাজ করছে।’
চলমান কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নগরবাসী জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের স্বস্তি পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
‘চট্টগ্রামে অতিবৃষ্টির রেকর্ড ৩৩০ মিলিমিটার পর্যন্ত রয়েছে। এত ভারী বৃষ্টিপাত হলে সাময়িক জলজট তৈরি হওয়া স্বাভাবিক, তবে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ চলছে।’
প্রয়োজনে নিচু এলাকাগুলোতে রাস্তা উঁচু করা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নও করা হবে বলে জানান তিনি।
সভায় জলাবদ্ধতা নিরসণে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘শুধু খাল খনন, ড্রেজিং বা রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; নাগরিকদের সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক খালের আউটলেট সচল থাকলেও খাল-নালায় মানুষের ফেলা আবর্জনা পানি প্রবাহে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।’
পরিচ্ছন্নতা অভিযানে খাল থেকে তোষক, চেয়ার, টেবিল, পলিথিন ও বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যবর্জ্য পর্যন্ত উদ্ধার হচ্ছে উল্লেখ করে হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এসব অপসারণ কোনো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তাই জনগণকে সচেতন করতেই হবে।’
‘নির্মাণাধীন ভবনের বালু ও বর্জ্য ড্রেনে ফেলে দেওয়াও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ।’
সভায় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগরীর অধিকাংশ পানি নিষ্কাশনের পথ বন্দর এলাকা হয়ে কর্ণফুলী নদী ও সাগরে গিয়ে মিশেছে। তাই বন্দর এলাকায় পানি চলাচলের পথ সচল রাখা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।’
তিনি আরো বলেন, ‘দিনভর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের দায়িত্বাধীন অংশ সচল রাখতে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতেও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’
সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা যেসব এলাকায় কাজ করছেন, তাদের কার্যক্রম সফল করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ও সমন্বিতভাবে কাজ করবে বলে জানান রাজিব আহসান।
কর্ণফুলী নদীকে দেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন আখ্যা দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এ নদী রক্ষার দায়িত্ব সবার। একই সঙ্গে হালদা নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদও দূষণের ঝুঁকিতে পড়ছে।’
এ অবস্থায় জনগণকে সচেতন করতে সাংবাদিকদের আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে বলে প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সভাপতির বক্তব্যে চসিকের মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘সাম্প্রতিক বৈশাখী ঝড় ও টানা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর কয়েকটি এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও সেটি মূলত চলমান উন্নয়নকাজের কারণে হয়েছিল।’
‘৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ হিজড়া খাল, জামালখান খাল, রামপুরা খাল ও আজববাহার খালসহ বিভিন্ন খাল প্রশস্ত ও গভীর করার কাজ করছে। এসব খালে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের সময় অস্থায়ী বাঁধ দেওয়ায় কয়েকটি স্থানে পানি জমেছিল। তবে বাঁধ খুলে দেওয়ার পর ধীরে ধীরে পানি নেমে যায়। আগে সরু থাকা খালগুলো এখন অনেক প্রশস্ত ও গভীর হয়েছে এবং এ কাজে বহু অবৈধ স্থাপনাও উচ্ছেদ করা হয়েছে।’
মেয়র আরো বলেন, ‘চট্টগ্রামকে “ক্লিন, গ্রিন, হেলদি, সেফ ও স্মার্ট সিটি” হিসেবে গড়ে তুলতে নাগরিকদের দায়িত্ববোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, নাগরিক সচেতনতাও জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চসিক ইতোমধ্যে স্কুল হেলথ স্কিম চালু করেছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এসব শিক্ষার্থী নিজেদের পরিবারেও সচেতনতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা একটি টেকসই শহর গড়তে চাই, যেখানে আগামী প্রজন্ম নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশ পাবে।’
মেয়র জানান, গত বছর চট্টগ্রামে ৫০-৬০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে ৫৭টি খাল এবং প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছে। এর মধ্যে সিডিএ ৩৬টি ও চসিক ২১টি খালের কাজ করছে। এছাড়া বড় আকারের বাড়াইপাড়া খালের কাজও সম্পন্ন হয়েছে।’
সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে আগামী বর্ষা মৌসুমে নগরীর ৭০-৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতা ও জলজট নিরসন সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ বলেন, ‘নিয়মিত মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে পানি প্রবাহ সচল রাখা হচ্ছে, যাতে খালগুলোর পানি দ্রুত নদীতে নেমে যেতে পারে। জলাবদ্ধতা নিরসনে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, বন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম সেটিকে কার্যকরভাবে সহায়তা করবে।’
এ লক্ষ্যে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
















