পরিবারের কোনো সদস্যের স্তন ক্যানসার হলে অন্য সদস্যদের মনেও স্বাভাবিকভাবে উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষ করে মা, বোন কিংবা মেয়ের স্তন ক্যানসার শনাক্ত হলে প্রশ্ন আসে—আমারও কি এই রোগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে? পরিবারের কারও ক্যানসার না থাকলে কি নিশ্চিন্ত থাকা যায়? এসব প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি এবং বংশগতির ভূমিকা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন।
স্তন ক্যানসার একটি জটিল রোগ। বয়স, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য-ইতিহাস, হরমোন-সম্পর্কিত বিষয় এবং জীবনযাপনের কিছু বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন কারণে এর ঝুঁকি প্রভাবিত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে বংশগত জিনগত পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে পারিবারিক ইতিহাস থাকলেই যে কারও স্তন ক্যানসার হবে, তা নয়। আবার পরিবারে আগে কারও এই রোগ না থাকলেও স্তন ক্যানসার হতে পারে।
অক্টোবর স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাসে নিজের পারিবারিক ইতিহাস জানা এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
পারিবারিক ইতিহাস কেন গুরুত্বপূর্ণ :
স্তন ক্যানসারের কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জিনের বংশগত পরিবর্তন ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিআরসিএ১ ও বিআরসিএ২ এমন দুটি জিন, যেগুলোর কিছু ক্ষতিকর পরিবর্তনের সঙ্গে স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। তবে সব স্তন ক্যানসার বংশগত কারণে হয় না।
পরিবারে একাধিক সদস্যের স্তন ক্যানসার, অল্প বয়সে রোগ শনাক্ত হওয়া, ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ইতিহাস কিংবা পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্যের স্তন ক্যানসার—এসব তথ্য চিকিৎসকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এমন ইতিহাস থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী জিনগত পরামর্শ বা পরীক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।
জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত হওয়া মানেই নিশ্চিতভাবে ক্যানসার হবে, তা নয়। বরং এর অর্থ হলো ব্যক্তির ঝুঁকি মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি কমানোর পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
পরিবারে ইতিহাস না থাকলে কি পরীক্ষা প্রয়োজন নেই :
এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। অনেক স্তন ক্যানসার রোগীর পরিবারে আগে এই রোগের কোনো ইতিহাস থাকে না। তাই পারিবারিক ইতিহাস না থাকাকে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী স্তন ক্যানসার শনাক্তকরণের পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। ম্যামোগ্রাফি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ক্রিনিং পদ্ধতি। তবে কখন থেকে এবং কত ব্যবধানে পরীক্ষা করা হবে, তা ব্যক্তির বয়স, ঝুঁকি ও প্রযোজ্য চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
একই সঙ্গে স্তনে নতুন চাকা, ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, নিপল ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া বা অস্বাভাবিক স্রাব দেখা দিলে নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের সময়ের জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। এসব পরিবর্তনের কারণ নির্ণয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
পরিবারের সদস্যদের সচেতন করতে কী করা যায় :
পরিবারে স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে রোগ নির্ণয়ের সময়, আক্রান্ত সদস্যের সঙ্গে সম্পর্ক এবং রোগের ধরন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করুন। চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করার সময় এই তথ্যগুলো ঝুঁকি মূল্যায়নে সহায়তা করতে পারে।
পরিবারের নারীদের স্তন ক্যানসারের লক্ষণ সম্পর্কে জানানো, প্রয়োজন অনুযায়ী স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ নেওয়া এবং অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করা জরুরি। তবে ভয় দেখিয়ে নয়, সঠিক তথ্য দিয়ে সচেতনতা তৈরি করাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।
ঝুঁকি জানুন, সিদ্ধান্ত নিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে :
স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য, পরিচিত ব্যক্তির অভিজ্ঞতা কিংবা অনুমানের ওপর নির্ভর না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের ক্যানসার কেয়ার সেন্টারে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও চিকিৎসা পরিকল্পনার গুরুত্ব রয়েছে। নিজের পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে চিকিৎসককে জানানো এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ফলোআপ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া সচেতন স্বাস্থ্যচর্চার অংশ।
স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতার অর্থ শুধু রোগ শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়া নয়; বরং নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে জানা, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নির্ধারণ করা এবং পরিবারের সদস্যদেরও সঠিক তথ্য জানানো। এই অক্টোবরের অঙ্গীকার হোক—ভয় নয়, তথ্যভিত্তিক সচেতনতা; অনুমান নয়, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ।
লেখক : সিনিয়র কনসালট্যান্ট, মেডিকেল অ্যান্ড রেডিয়েশন অনকোলজি, এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম
















