স্ট্রোকের কথা উঠলে অনেকেই মনে করেন, এটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা—যার আগে তেমন কোনো সতর্কবার্তা থাকে না। বাস্তবে স্ট্রোক আকস্মিকভাবে প্রকাশ পেলেও এর পেছনে দীর্ঘদিনের কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি কাজ করতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে চর্বির অস্বাভাবিক মাত্রা, ধূমপান এবং কিছু হৃদ্রোগ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। এসব ঝুঁকি সম্পর্কে জানা এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই স্ট্রোকের আশঙ্কা কমানো সম্ভব।
স্ট্রোক প্রতিরোধের প্রথম ধাপ তাই শুধু রোগ সম্পর্কে জানা নয়; নিজের স্বাস্থ্যঝুঁকি চিহ্নিত করে নিয়মিত নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি।
উচ্চ রক্তচাপ : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিগুলোর একটি
উচ্চ রক্তচাপকে অনেক সময় নীরব স্বাস্থ্যসমস্যা বলা হয়, কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মস্তিষ্কের রক্তনালির ওপর চাপ বাড়ে এবং রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর ফলে রক্তনালি বন্ধ হয়ে অথবা ফেটে গিয়ে স্ট্রোক হতে পারে।
শুধু মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরার সময় রক্তচাপ মাপলেই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ এবং নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ না করা গুরুত্বপূর্ণ। লবণ গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
ডায়াবেটিস ও রক্তে চর্বির ভূমিকা :
দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে রক্তনালি ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে চর্বির অস্বাভাবিক মাত্রা থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু রক্তে শর্করা পরীক্ষা করাই নয়, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, কিডনির স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিও নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে রক্তনালির ভেতরে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে রক্তপ্রবাহে বাধা তৈরি করতে পারে। সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
হৃদ্রোগ থেকেও হতে পারে স্ট্রোক :
হৃদ্যন্ত্রের কিছু সমস্যা, বিশেষ করে অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন নামে পরিচিত অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন, স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ অবস্থায় হৃদ্যন্ত্রের ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে, যা রক্তপ্রবাহের সঙ্গে মস্তিষ্কে পৌঁছে রক্তনালি বন্ধ করে দিতে পারে। সবার ক্ষেত্রে এই সমস্যা একইভাবে প্রকাশ পায় না। বুক ধড়ফড় করা, অনিয়মিত নাড়ির স্পন্দন বা আগে থেকে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করে স্ট্রোক প্রতিরোধে উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়া যায়।
জীবনযাপনে কোন পরিবর্তনগুলো জরুরি? :
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন- ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য পরিহার করুন; শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য ও স্বাস্থ্যকর খাবারকে খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দিন; অতিরিক্ত লবণ, অস্বাস্থ্যকর চর্বি ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমান; শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করুন; পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন এবং ওজন স্বাস্থ্যকর সীমায় রাখার চেষ্টা করুন; রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়মিত পরীক্ষা করুন; চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন; নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করবেন না ইত্যাদি।
যাদের পরিবারে স্ট্রোক বা অল্প বয়সে হৃদ্রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ব্যক্তিগত ঝুঁকি সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উপকারী। তবে পারিবারিক ইতিহাস থাকলেই স্ট্রোক হবে, এমন নয়; আবার পরিবারে কারও স্ট্রোক না হলেও ঝুঁকি থাকতে পারে।
লক্ষণ দেখা দিলে প্রতিরোধের পরিকল্পনা নয়, জরুরি চিকিৎসা :
মুখ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি বা ভারসাম্যে সমস্যা—এসব স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এমন হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। লক্ষণ নিজে থেকে সেরে গেলেও অবহেলা করা উচিত নয়।
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের নিউরোলজি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি, সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসমস্যা এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে ব্যক্তিভিত্তিক দিকনির্দেশনা নেওয়া যেতে পারে। তবে স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে নিয়মিত পরামর্শের জন্য অপেক্ষা না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে।
স্ট্রোক প্রতিরোধের সব ঝুঁকি দূর করা সম্ভব নয়, কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সঠিক চিকিৎসা এবং সচেতন জীবনযাপন—এই তিনটি অভ্যাস মস্তিষ্কের সুস্থতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
লেখক : সিনিয়র কনসালট্যান্ট, নিউরোলজি, এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম
















