চট্টগ্রাম : সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও যৌথ অগ্রগতি- এই মটোকে সামনে নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সাথে আরও নিবিড় যোগাযোগ বৃদ্ধি ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করাসহ শিল্প পরিচালনার ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিরসনের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিনিয়োগকারীদের নিয়ে ‘মিট দ্য ইনভেস্টরস’ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) চট্টগ্রামের একটি হোটেলে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বেপজাধীন চট্টগ্রাম ইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেড, কুমিল্লা ইপিজেড, বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-১ ও বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-২’-এর শতাধিক দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী অংশ নেন।
চট্টগ্রামে আয়োজিত এ ‘মিট দ্য ইনভেস্টরস’ অনুষ্ঠানটি এ বছরে বেপজার দ্বিতীয় আয়োজন। এর আগে গত ১০ অক্টোবর ২০২৬ বেপজা কর্তৃক ঢাকা ইপিজেড, আদমজী ইপিজেড, উত্তরা ইপিজেড, মোংলা ইপিজেড, ঈশ্বরদী ইপিজেডের বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে ঢাকায় একটি ‘মিট দ্য ইনভেস্টরস’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ওই অনুষ্ঠানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আরও দ্রুত, সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর সেবা প্রদানের লক্ষ্যে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বিনিয়োগকারীদের জন্য তিনটি বিশেষায়িত কান্ট্রি ডেস্ক চালু করা হয়েছে। বেপজার শীর্ষ তিন বিনিয়োগকারী দেশ চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বিদ্যমান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সুসংগঠিত করা, তাদের বিনিয়োগসংক্রান্ত চাহিদা অনুযায়ী সরাসরি সহায়তা দেওয়া এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে সহজতর করার লক্ষ্যেই এই বিশেষায়িত ডেস্কগুলো চালু করা হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় বেপজাধীন চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের সাথে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে শনিবার এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “যোগাযোগ হলো সম্মানের সর্বোচ্চ রূপ। আজকের এই অনুষ্ঠান আমাদের অংশীদারত্ব দৃঢ় করার, বিনিয়োগকারীদের কথা সরাসরি শোনার, তাঁদের সমস্যা ও প্রত্যাশাগুলো বোঝার এবং আমাদের বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক ও ব্যবসাবান্ধব করে তোলার উপায় খুঁজতে সাহায্য করবে।”
বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘আমরা এমন এক কঠিন সময়ে একত্র হয়েছি যখন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি জ্বালানি বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী ব্যবসায় পরিচালনার খরচ বেড়ে চলেছে।’’
বিনিয়োগকারীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘‘বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত নানা বাধা অতিক্রম করেও আপনারা নিজেদের সহনশীলতা ও ইতিবাচত মনোভাব দিয়ে এই অর্থনীতিকে সচল রাখছেন।
“আপনাদের অদম্য আশাবাদ, অবিচল সাহস, মেধা ও সততা এই অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমরা আপনাদের নিয়ে গর্বিত।”
বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরিতে শ্রমিকদের দক্ষতার প্রশংসা করে এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন “উচ্চমানসম্পন্ন পোশাক ও ন্যাটোর সামরিক লজিস্টিকস থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক র্যাম্পের ফ্যাশন পোশাক কিংবা নরডিক দেশের কনের বিয়ের গাউন সবই তৈরি হয় আমাদের ইপিজেডগুলোতে।’’
শ্রমিকদের নিপুণ হাতের কাজের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন “আমাদের শ্রমিকদের কারুকাজ ও শিল্পশৈলী অনন্য এবং বিশ্বমানের। ইপিজেডগুলোতে তারা জুতো, তৈরি পোশাক, গহনা, চশমা, ব্যাগ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, বিয়ের পোশাক, এমনকি শান্তিরক্ষা মিশনের পোশাকও তৈরি করছে।’
নির্বাহী চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘‘প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বেপজা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেপজা ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। একই অর্থবছরে বেপজাধীন জোনসমূহ থেকে রপ্তানী হয়েছে ৮.৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২.২২ শতাংশ বেশি।’
‘চলতি বছরে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-১, বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-২, যশোর ইপিজেড ও পটুয়াখালী ইপিজেডকে পূর্ণাঙ্গ জোন হিসেবে ঘোষণাও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।’
তিনি বিনিয়োগকারীদের তাঁদের সাপ্লাই চেইন অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে এসব নতুন জোনে ব্যবসায় সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বেপজা সর্বদা বিনিয়োগকারীদের মূল্যবান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। আপনাদের মূল্যবান মতামত আমাদের কৌশলগুলোকে আরও শক্তিশালী করে। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে, বেপজা প্রতিটি পদক্ষেপে আপনাদের পাশে রয়েছে এবং যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।”
অনুষ্ঠানে বেপজার সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভীর হোসেন তার উপস্থাপনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেপজার গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ও অগ্রগতি তুলে ধরেন।
তিনি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন বিনিয়োগ চুক্তি, প্রতি একর জমিতে বেপজার অবদান, ইপিজেডের প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে টেকনোলজি ও নলেজ ট্রান্সফার, শ্রমিকদের কল্যাণে গৃহীত পদক্ষেপ, বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে নীতি ও প্রক্রিয়াগত উন্নয়নের বিষয়ে আলোচনা করেন।
পাশাপাশি বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহ এবং যশোর ও পটুয়াখালীতে নতুন ইপিজেড স্থাপনের অগ্রগতি তুলে ধরে তানভীর হোসেন বিনিয়োগকারীদের এসব জোনে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
বেপজাধীন চালু জোনগুলোতে জমির সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উল্লেখ করে সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) বলেন, ‘সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে বেপজা জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।’
তিনি বলেন, “এই সীমিত ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে বেপজা প্রতি একর জমিতে ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে এবং একই সাথে প্রতি একর জমি থেকে বার্ষিক ১৩.৮২ কোটি টাকার রিটার্ন অর্জিত হচ্ছে।’’
‘আস্থা ও বিশ্বাসের গৌরবময় ঐতিহ্য, ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের প্রত্যয় : চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক উপস্থাপনায় বেপজার অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক (এন্টারপ্রাইজ সার্ভিসেস ও শিল্প সম্পর্ক) মো. নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া ইপিজেডের শ্রমিক কল্যাণ, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, শ্রম আইন সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেপজার বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
তিনি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা, আন্তর্জাতিক শ্রমমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৯’ এর সংশোধন এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী সেবা সম্প্রসারণে বেপজার অগ্রগতি তুলে ধরেন। এ সময় ৪৫টি অনলাইন সেবা, ২৪ ঘণ্টা চালু বেপজা হেল্পলাইন (১৬১২৮), শ্রমিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং ‘এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম (ইআইএস)’ বাস্তবায়নের অগ্রগতিও উপস্থাপন করা হয়।
পরবর্তী বেপজার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বেপজার বিভিন্ন সেবা, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বিদ্যমান শিল্প পরিচালনার চ্যালেঞ্জ নিরসন, সম্ভাব্য বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরও উন্নত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। ‘বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৯’ নিয়েও মতবিনিময় হয়। এ সময় আন্তর্জাতিক শ্রমমান বজায় রেখে বিনিয়োগকারী ও শ্রমিক-উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণে বেপজার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেপজা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে বেপজাধীন আটটি ইপিজেড ও দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশ্বের ৩৮টি দেশের বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করেছেন। এসব জোনে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৭.৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ক্রমপুঞ্জীভূত রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বেপজাধীন জোনগুলো দেশের মোট রপ্তানিতে প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রাখছে এবং দেশের মোট এফডিআইয়ে বেপজার অবদান ১৯.১৭ শতাংশ.
















